সিলেট

কলাগাছের সুতার ‘কলাবতী’ শাড়ির উদ্ভাবক রাধাবতী, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে থমকে সম্ভাবনা

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৩৮

সংগৃহীত ছবি।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মণিপুরি তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবী ২০২৩ সালে কলাগাছের তন্তু দিয়ে শাড়ি তৈরি করে দেশব্যাপী আলোচনায় এসেছিলেন। ‘কলাবতী’ নামে পরিচিত সেই শাড়ি একসময় সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন হিসেবে প্রশংসা কুড়ালেও বর্তমানে পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণা ও অর্থায়নের অভাবে উদ্যোগটি কার্যত থমকে গেছে।

কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুবিল মাঝেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা রাধাবতী দেবী ১৯৭৫ সাল থেকে মণিপুরি তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শাড়ি, গামছা, মাফলার, ওড়না ও থ্রিপিস তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ কাজে তিনি ভারতসহ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।

রাধাবতী জানান, ২০২৩ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে তাকে বান্দরবানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাহাড়ি কলাগাছের তন্তুর সঙ্গে তাঁতের সুতা মিশিয়ে একটি বিশেষ শাড়ি তৈরি করেন তিনি। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে সেই শাড়ির নাম রাখা হয় ‘কলাবতী’।

মাত্র ১৫ দিনে তিন সহযোগীর সহায়তায় তৈরি সেই শাড়ি পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপহার দেওয়া হয়। উদ্ভাবনী এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এক লাখ টাকা ও সম্মাননা লাভ করেন।

তবে সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। রাধাবতী দেবী বলেন, “এ পর্যন্ত মাত্র নয়টি কলাবতী শাড়ি তৈরি করেছি। একটি শাড়ি তৈরিতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় এবং ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ না থাকায় এই শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।”

তিনি আরও জানান, কলাগাছের যে বিশেষ তন্তু ব্যবহার করা হয়, তা সিলেট অঞ্চলে পাওয়া যায় না। বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

রাধাবতীর মতে, এই শিল্পকে টেকসই ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রয়োজন। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেই ধরনের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেনি।

জানা গেছে, ২০২৩ সালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে ৩০ জন ত্রিপুরা নারীকে কলাগাছের তন্তু দিয়ে শাড়ি তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। একই বছর জেলা প্রশাসনের সহায়তায় আরও ৫০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে প্রকল্পটি আর এগোয়নি।

বান্দরবান বিসিক কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. শামীম আলম বলেন, প্রকল্পটির উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় তা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি এবং পরে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহা বলেন, কলাগাছের সুতার শাড়ি এখনও বাজারজাত করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এটি আরও মসৃণ, আরামদায়ক ও বাজার উপযোগী করতে গবেষণা প্রয়োজন।

স্থানীয় সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যথাযথ গবেষণা, কারিগরি উন্নয়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ‘কলাবতী’ শাড়ি দেশীয় হস্তশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে এবং গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন


বিজ্ঞাপন