আওতাভুক্ত এলাকাতেও প্রতিদিন ঘাটতি ১ কোটি ২০ লাখ লিটার, বাস্তবায়ন হয়নি ৮০৬ কোটি টাকার চেঙ্গেরখাল পানি শোধনাগার (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) প্রকল্প।
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৪৭
ছবি: এআই নির্মিত
সিলেট নগরে বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। প্রায় ১০ লাখ জনসংখ্যার এই নগরে প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ১২ কোটি লিটার। অথচ সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে মাত্র ২৪টি ওয়ার্ড। এর বাইরে থাকা ১৮টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত। এমনকি পানি সরবরাহের আওতাধীন ২৪টি ওয়ার্ডেও চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করতে পারছে না সিলেট সিটি করপোরেশন। এসব এলাকায় প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের পুরোনো ২৭টি ওয়ার্ডের সঙ্গে ২০২১ সালে যুক্ত হয় আরও ১৫টি ওয়ার্ড। এতে নগরের মোট ওয়ার্ড সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২টি। নগরের আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বিশুদ্ধ পানির চাহিদাও। তবে সেই অনুপাতে পানি উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট এখন নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, পানি সরবরাহের আওতাধীন ২৪টি ওয়ার্ডে দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৬ কোটি লিটার। বিপরীতে সিসিকের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪ কোটি ৮০ লাখ লিটার। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ৮০ শতাংশ পানি। প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে ১ কোটি ২০ লাখ লিটার।
অন্যদিকে, পুরো নগরের দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ১২ কোটি লিটার। অর্থাৎ পানি সরবরাহের আওতার বাইরে থাকা ১৮টি ওয়ার্ডকে বাদ দিয়েই বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। ফলে নগরের সব এলাকায় সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
পানি সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে। রান্নাবান্না, গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা। কোথাও নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এদিকে, নতুন করে জ্বালানি সংকট এই ভোগান্তির তীব্রতা বাড়িয়েছে বহুগুণ। কারণ নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কারণে সাপ্লাইয়ের পানি সময়মত পাচ্ছেন না বহু এলাকার বাসিন্দারা।
পানি সংকটের দাবি নিয়ে সিসিকে গিয়ে আটক ৬
এই পানি সংকট নিয়ে ক্ষোভের প্রকাশও ঘটেছে সম্প্রতি। নগরীর জল্লারপার এলাকায় দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনের দাবিতে সিসিক ভবনে গিয়ে পানি সরবরাহের দাবিতে বিক্ষোভের একপর্যায়ে ষষ্ঠ তলার একটি জানালায় ঢিল ছুড়ে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে ওই যুবকদের বিরুদ্ধে। পরে সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা ছয়জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।
তবে ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জল্লারপার এলাকার বাসিন্দারা। তাদের দাবি, সোমবার সিটি করপোরেশনে গিয়ে পানির সংকটের কথা জানালে তিন দিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় বৃহস্পতিবার শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে যান তারা।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, দাবি জানানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ভেতরে স্লোগান ও ভাঙচুরের ঘটনায় নিরাপত্তা শাখার কর্মীরা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে তাদের আটক করে। তাঁর দাবি, ঢিল ছোড়ায় ষষ্ঠ তলার কয়েকটি কাচ ভেঙেছে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়ছে চাপ
বর্তমানে নগরের পানির চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে। গভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করছে সিটি করপোরেশন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে পানির চাহিদা মেটানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা পরিবেশবিদদের।
একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। ফলে ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে নগরের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দৈনিক পানির ঘাটতি পূরণে নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে এতে সাময়িকভাবে সংকট কমলেও দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
৮০৬ কোটি টাকার প্রকল্প, কাটেনি সংকট
নগরের পানি সংকট নিরসনে ৮০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চেঙ্গেরখাল পানি শোধন প্রকল্প নেওয়া হলেও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি প্রকল্পটি। ফলে বিকল্প উৎস থেকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নের অপেক্ষাতেই রয়েছে।
সিলেট নগরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এর পাশাপাশি সুরমা নদীর দূষণও নগরে সারফেস ওয়াটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুরমা নদীর পানি দূষিত হওয়ায় নদী থেকে সরাসরি পানি সংগ্রহ করে পরিশোধনের মাধ্যমে নগরে সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে দূরবর্তী নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে নগরে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। এ লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রেশনিংয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা
বর্তমান সংকট সামাল দিতে পানি সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করছে সিটি করপোরেশন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় সব এলাকায় একই সময়ে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সিসিকের পানি শাখার সহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক তাপাদার বলেন, নগরের পানির চাহিদা পূরণে বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দৈনিক ঘাটতি পূরণে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, নগরের পানি সংকট নিরসনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নগরের সব এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ রয়েছে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি
নতুন নলকূপ দিয়ে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দিলেও, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকট কাটার সম্ভাবনা কম। নগরবাসীর আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পানি সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পানির উৎস নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নই হতে পারে সিলেটের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের টেকসই পথ।
নগরবাসীর মতে, শুধু নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জনসংখ্যা ও নগরের পরিধি যেভাবে বাড়ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জরুরি।
তাদের দাবি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি ৮০৬ কোটি টাকার চেঙ্গেরখাল পানি শোধন প্রকল্পসহ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরের সব ৪২টি ওয়ার্ডে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন