সংগৃহীত ছবি।
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতায় জীবনানন্দ দাশের স্বতন্ত্র অবদান, তাঁর নিভৃত জীবনবোধ, প্রকৃতিচেতনা, ইতিহাসের উপলব্ধি, বিষাদ ও মৃত্যুচিন্তা নিয়ে লেখাটি সাজানো হয়েছে। লেখকের দৃষ্টিতে জীবনানন্দের কবিতার নির্জনতা নিছক একাকিত্ব নয়; সেখানে প্রকৃতি, নক্ষত্র, হেমন্তের ধানক্ষেত, শিশির, ইতিহাস ও মানুষের মনের গভীর অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়েছে। সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর দেওয়া ‘নির্জনতম কবি’ পরিচয়ও লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালের এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্ম নেওয়া জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি। লেখাটিতে বলা হয়েছে, কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, পারিবারিক টানাপোড়েন ও অন্তর্দাহ তাঁর জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে আত্মমগ্ন ও নির্জনতার দিকে নিয়ে যায়; সেই অভিজ্ঞতারই শৈল্পিক রূপ দেখা যায় তাঁর কবিতায়।
জীবনানন্দের প্রকৃতিচিত্রে বাংলার চেনা দৃশ্য এক মায়াময় ও স্বপ্নিল রূপ পায়। তিনি বিশেষ করে হেমন্ত, কার্তিকের কুয়াশা, শিশিরভেজা ঘাস, ধানক্ষেত ও বাংলার নিভৃত প্রকৃতিকে কবিতায় তুলে ধরেছেন। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, কবির বাংলার সৌন্দর্য জাঁকজমকপূর্ণ নয়; তা শান্ত, নির্জন ও মায়াবী। ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার আকাঙ্ক্ষায় বাংলার প্রকৃতি ও মাতৃভূমির প্রতি তাঁর গভীর টান প্রকাশ পেয়েছে।
প্রকৃতির পাশাপাশি জীবনানন্দের কবিতায় ইতিহাস ও সময়ের বিস্তৃত অনুভব রয়েছে। ‘বনলতা সেন’ কবিতার হাজার বছর ধরে পথচলা ক্লান্ত মানুষের চিত্রকে লেখক ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রা, মানুষের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বিম্বিসার, অশোক, সিংহল ও মালয় সাগরের উল্লেখ কবিতায় অতীতের বিস্তৃত পরিসর তৈরি করে। সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষে বনলতা সেনের কাছে পাওয়া সামান্য শান্তি কবিতাটির অন্যতম অনুভব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
লেখাটিতে বিষাদ, মৃত্যুচেতনা ও পরাবাস্তবতাকেও জীবনানন্দের কাব্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ দিক বলা হয়েছে। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার উদ্ধৃতির মাধ্যমে আধুনিক মানুষের ক্লান্তি ও আত্মিক নিঃসঙ্গতার জটিল প্রকাশ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখকের পাঠে, কবিতায় মৃত্যু কেবল ধ্বংস নয়; তা স্তব্ধতা ও শান্তিতে বিলীন হওয়ার অনুভূতির সঙ্গেও যুক্ত। ‘সংক্রান্তি’ ও ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র কবিতায়ও এ ধরনের অনুভূতির ছায়া ফিরে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শব্দ ও চিত্রকল্প নির্মাণেও জীবনানন্দের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরেছেন লেখক। গন্ধ, রং, স্পর্শ ও শব্দকে মিলিয়ে তিনি এমন চিত্রকল্প তৈরি করেছেন, যা পাঠকের মনে মায়া ও ভাবনার পরিসর গড়ে তোলে। তাঁর কবিতাকে একসময় দুর্বোধ্য বা ব্যাকরণগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলেও সমালোচনা করা হয়েছিল; তবে লেখকের মতে, জীবনানন্দ নিজের সৃষ্টিশৈলীতে অবিচল ছিলেন।
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আট দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে ৫৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। লেখাটির উপসংহারে বলা হয়েছে, আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি ও কোলাহলে ক্লান্ত মানুষ এখনো জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতি, নির্জনতা ও সৌন্দর্যের আশ্রয় খুঁজে পায়।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন