সংগৃহীত ছবি।
রাসুলুল্লাহ (স.) এমন এক সময়ে আরবের মাটিতে আবির্ভূত হন, যখন সমাজে একদিকে ছিল ধর্মীয় বিভ্রান্তি ও নৈতিক অবক্ষয়, অন্যদিকে সাহস, অতিথিপরায়ণতা, আত্মমর্যাদা ও ভাষাগত দক্ষতার মতো কিছু প্রশংসনীয় গুণও ছিল। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সেই সমাজের বিশ্বাস, চরিত্র ও সামাজিক জীবনে গভীর পরিবর্তন ঘটে।
তৎকালীন আরব সমাজকে ‘জাহেলিয়াতের যুগ’ বলা হয়। তবে জাহেলিয়াত বলতে শুধু অজ্ঞতা বা অক্ষরজ্ঞানহীনতা বোঝায় না। আরবদের ভাষা ও কবিতায় অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তাদের মূল সংকট ছিল বিশ্বাস, নৈতিকতা ও জীবনদর্শনের সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব।
মূর্তিপূজায় আচ্ছন্ন ধর্মীয় জীবন
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আগমনের আগে আরবের ধর্মীয় জীবনে শিরক ও মূর্তিপূজা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর তাওহিদের শিক্ষা অনেকাংশে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। মানুষ আল্লাহকে মানার পাশাপাশি বিভিন্ন মূর্তি ও উপাস্যকে তাঁর সঙ্গে শরিক করত।
কোরআন তাদের সেই ভ্রান্ত বিশ্বাসের অসারতা তুলে ধরে বলেছে, ‘তারা আল্লাহর জন্য এমন সব শরিক সাব্যস্ত করে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, অথচ তারাই সৃষ্ট।’ (সুরা আরাফ: ১৯১)
ইসলাম মানুষকে এই শিরক থেকে বের করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানায়। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।’ (সুরা বাকারা: ১৬৩)
গোত্রীয় বিভাজন ও সংঘাত
তৎকালীন আরব সমাজ ছিল গভীরভাবে গোত্রকেন্দ্রিক। গোত্রের স্বার্থ, সম্মান ও প্রতিশোধকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটত। কোনো কোনো বিরোধ দীর্ঘ সময় ধরে চলত এবং এক প্রজন্মের প্রতিশোধ আরেক প্রজন্ম পর্যন্ত গড়াত।
ইসলাম এই সংকীর্ণ গোত্রীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের বৃহত্তর পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের পরিচিত হও। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)
অর্থাৎ বংশ, গোত্র বা সম্পদ নয়, তাকওয়াই মানুষের মর্যাদার মূল মাপকাঠি।
নারীর প্রতি অবমাননা
জাহেলি আরব সমাজের অন্যতম ভয়াবহ দিক ছিল কন্যাশিশুর প্রতি নির্মমতা। কোনো কোনো পরিবার কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জা ও বোঝা মনে করত। এমনকি কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ঘটনাও ঘটত।
পবিত্র কোরআন কেয়ামতের দিনের বিচারের দৃশ্য তুলে ধরে বলেছে, ‘আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির: ৮-৯)
ইসলাম এই নির্মমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং নারী ও কন্যাসন্তানের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। নারীর উত্তরাধিকার অধিকার নির্ধারণ ও নিশ্চিত করা হয়। কন্যাসন্তানকে লালন-পালনের দায়িত্বকেও মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
মদ, জুয়া ও সামাজিক অনাচার
মদ্যপান ও জুয়া তৎকালীন আরব সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এর সঙ্গে নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক অনাচারও যুক্ত ছিল। এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, দুর্বল মানুষের অধিকার নষ্ট করা এবং অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করার মতো প্রবণতাও সমাজে ছিল।
ইসলাম এসব অনাচারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিধান দেয়। মদ ও জুয়া সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণের শর হলো অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা মায়িদা: ৯০)
অন্ধকারের মধ্যেও কিছু গুণ
জাহেলি আরব সমাজে সব ধরনের ভালো গুণ অনুপস্থিত ছিল না। অতিথিপরায়ণতা, সাহস, আত্মমর্যাদা, উদারতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং ভাষা ও কবিতায় অসাধারণ দক্ষতা তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল।
ইসলাম এসব গুণকে বিলীন করেনি। সেগুলোকে সঠিক বিশ্বাস ও নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত করেছে। উদারতা উৎসাহিত হয়েছে দান-সদকায়, সাহস সত্যের পক্ষে দৃঢ়তায় এবং আত্মমর্যাদা অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষায়।
‘জাহেলিয়াত’ কেন বলা হয়?
তৎকালীন আরবদের ভাষা, কবিতা, স্মৃতিশক্তি ও বাগ্মিতার যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল। তাই তাদের জাহেলিয়াতকে জ্ঞান-বুদ্ধির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মূল সমস্যা ছিল সঠিক বিশ্বাস, নৈতিকতা ও জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। এর আগে তারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় ছিল।’ (সুরা জুমুআ: ২)
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দাওয়াত মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধিকে অস্বীকার করেনি। তিনি মানুষের বিশ্বাসকে শুদ্ধ করেছেন, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করেছেন এবং জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনার অধীনে পরিচালনার শিক্ষা দিয়েছেন।
একজন নবী, একটি সমাজের আমূল পরিবর্তন
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দাওয়াত মানুষের বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনে। মূর্তিপূজার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাওহিদ। গোত্রীয় সংকীর্ণতার পরিবর্তে গড়ে ওঠে ঈমানের ভ্রাতৃত্ব। অন্যায়ের পরিবর্তে গুরুত্ব পায় ন্যায়বিচার। মানুষের মর্যাদার ভিত্তি হয়ে ওঠে তাকওয়া।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্র ছিল আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আদর্শ অনুসরণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)
আরবের জন্য নয়, সমগ্র মানবতার জন্য
রাসুলুল্লাহ (স.) আরবে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর দাওয়াত কোনো জাতি বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আল্লাহ তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘বলে দিন, হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসুল।’ (সুরা আরাফ: ১৫৮)
তাঁর সাহাবায়ে কেরাম পরবর্তী সময়ে সেই বার্তা আরবের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেন।
জাহেলিয়াত থেকে আলোর পথে
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আগমন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। তাঁর দাওয়াত মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও জীবনযাপনে গভীর পরিবর্তন এনেছিল। শিরকের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাওহিদ, গোত্রীয় অহংকারের পরিবর্তে তাকওয়া, সামাজিক অবিচারের পরিবর্তে ন্যায় এবং নৈতিক অবক্ষয়ের পরিবর্তে উত্তম চরিত্রের শিক্ষা।
জাহেলিয়াত থেকে ইসলামের পথে আরবের এই পরিবর্তন দেখিয়ে দেয়, একটি সমাজের প্রকৃত সংস্কার শুরু হয় মানুষের বিশ্বাস ও চরিত্রের পরিবর্তন থেকে। রাসুলুল্লাহ (স.) সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়ে আরব সমাজকে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর দাওয়াত তাওহিদ, ন্যায়, মানবিকতা ও উত্তম চরিত্রের আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
ধর্ম ও জীবন থেকে আরো পড়ুন