প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:১১
কুলাউড়ার রাবার শিল্পে দুর্দিন, লোকসানে বাগানগুলো

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ভাটেরা রাবার বাগানে রাবার গাছ।

কুলাউড়ার রাবার শিল্প দুর্দিনের মুখোমুখি হয়েছে। এক সময় স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার অন্যতম উৎস ছিল এই শিল্প, তবে রাবার গাছের বয়স বৃদ্ধি, উৎপাদন হ্রাস, মজুরি বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের ওঠানামা ও আধুনিক প্রযুক্তির সংকটসহ নানা কারণে এই শিল্প এখন লোকসানের মুখে।

সিলেট বিভাগে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে চারটি সরকারি রাবার বাগানের মধ্যে কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে অবস্থিত ভাটেরা রাবার বাগান। সরকারি এই বাগান ছাড়াও চা বাগান পরিচালিত ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোট-বড় আরও ১৮টি রাবার বাগান রয়েছে কুলাউড়ায়। ভাটেরা সরকারি রাবার বাগানে ২ হাজার ৮৯৯ একর বনভূমিজুড়ে রাবার চাষ হচ্ছে, যার অধিকাংশ এলাকায় থাকা পুরোনো গাছ ইতিমধ্যে উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

বাগান সূত্রে জানা যায়, একটি রাবার গাছ সাত থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত লেটেক্স উৎপাদন করতে পারলেও এরপর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। এক সময় অধিক পরিমাণে উৎপাদন হলেও কয়েক বছর ধরে লোকসানের মুখে রয়েছে ভাটেরা বাগান। ভাটেরা রাবার বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাগানে ৮ কোটি টাকা খরচের বিপরীতে ২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তবে লোকসান হলেও পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও জানান, পুরোনো গাছ কেটে নতুন রাবার গাছ রোপণ করা হচ্ছে, যার আওতায় ৭০ একর জায়গায় নতুন গাছ লাগানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সনাতনী পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক ধোঁয়াঘর তৈরির কাজও হাতে নেওয়া হচ্ছে। বাগানে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ২৫০ শ্রমিক কর্মরত আছেন, যাদের মধ্যে স্থায়ী শ্রমিকের মাসিক বেতন প্রায় ৩০ হাজার এবং অস্থায়ী শ্রমিকের প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বর্তমানে নতুন-পুরোনো গাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার কেজি রাবারের কষ উৎপাদিত হচ্ছে, যা ঠান্ডা আবহাওয়ার মৌসুমে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দ্বিগুণ হয়ে যায় বলে জানান তিনি। তিনি জানান, সিলেট অঞ্চলের রাবার গুণে-মানে ভালো হওয়ায় তা থেকে কনডম, গাড়ি ও বিমানের চাকা-টিউব তৈরি হয় এবং শ্রীলঙ্কা ও ভারতে রপ্তানি হয়।

কুলাউড়ার টিলাগাঁও ইউনিয়নে ব্রিটিশ মালিকানাধীন ডানকানের লংলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের বাগানের ২৫৫ হেক্টর টিলা ভূমিতে রাবার চাষ হলেও গাছের বয়স বেশি হওয়ায় উৎপাদন কমেছে এবং শ্রমিকদের পারিশ্রমিক মিটিয়ে লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না। একইভাবে জয়চণ্ডী ইউনিয়নের ন্যাশনাল টি কোম্পানির বিজয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির তালুকদার জানান, তাদের বাগানের ৯৮ হেক্টর জমিতে রাবার চাষে উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়লেও তা এখনো আশানুরূপ নয়।

ভাটেরা রাবার বাগানের টেপার জামান মিয়া বলেন, রাবার শিল্প দিনদিন পিছিয়ে পড়ছে এবং পুরোনো সব গাছ কেটে নতুন গাছ রোপণ করা প্রয়োজন। তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সঠিক মৌসুমে একটি গাছ থেকে দৈনিক আধা কেজি পর্যন্ত রাবারের কষ পাওয়া গেলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে। এ ছাড়া রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক ধোঁয়াঘর স্থাপনও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি, কেননা তাদের বাগানের বিদ্যমান ধোঁয়াঘরের অবস্থা নাজুক।