ধোপাজান নদীর মুখে বালু লুট ঠেকাতে সিসি ক্যামেরায় পুলিশের নজরদারি।
সুনামগঞ্জের অন্যতম বালু-পাথরমহাল ধোপাজানে বালু লুট ঠেকাতে এবার সিসি ক্যামেরায় নজরদারি শুরু করেছে পুলিশ। বালু-পাথরমহালে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি দেশে এটিই প্রথম বলে দাবি করা হয়েছে। এতে অবৈধভাবে বালু পরিবহন কিছুটা কমলেও লুটেরা চক্রকে পুরোপুরি নিবৃত্ত করা সম্ভব হয়নি। এখন গ্রামীণ বিভিন্ন সড়ক দিয়ে ছোট যানবাহনে বালু সরানোর চেষ্টা করছে চক্রটি।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শেষ সীমানায় ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে এসেছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা চলতি নদী। নদীর প্রবেশমুখে জেলার একমাত্র বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ধোপাজান। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আদেশ দেন আদালত।
কয়েক বছর বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেখানে ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলন শুরু হয়। কয়েক দফা লুটপাটে সরকার কয়েক শ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় বালু লুট বন্ধ না করার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে তৎকালীন পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন প্রত্যাহার হন। পরে প্রশাসন তৎপর হলে বালু উত্তোলন ফের বন্ধ হয়।
বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও সরকারি সিদ্ধান্তে গত বছরের অক্টোবর মাসে নদীতে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাত্র এক কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে ১ কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি পায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এরপর নদীর একাধিক স্থানে পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে।
অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই নদীসংলগ্ন এলাকার বসতভিটা, ফসলি জমি, বাঁধ, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। এ অবস্থায় স্থানীয়রা আন্দোলন ও প্রতিবাদ শুরু করেন। পরে লিমপেডের বালু উত্তোলন বন্ধ হয়। তবে রাতের আঁধারে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু লুট বন্ধ হয়নি।
এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ। ধোপাজান নদীর মুখে পুলিশের চেকপোস্ট বসিয়েও বালু লুট পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ সদর থানার উদ্যোগে ধোপাজানে বালু লুট ঠেকাতে পুলিশ চৌকির পাশাপাশি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি শুরু হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, আগে রাতে কিংবা বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নৌকায় বালু নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। পুলিশ চৌকিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পর নজরদারি বেড়েছে। এতে অবৈধভাবে বালু পরিবহনে জড়িতদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
নদীতীরের বাদেরটেক গ্রামের আবু সাঈদ বলেন, রাতে চুরি করে অনেকে বালু নিয়ে যেতেন। এ কারণে পুলিশ ক্যাম্পে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এখন কেউ যাওয়ার সাহস করে না। পুলিশ ধরলে নৌকাসহ থানায় নিয়ে যায়।
একই গ্রামের মহিনুর মিয়া বলেন, আগে চুপচাপ ম্যানেজ করে নৌকায় বালু নিয়ে যাওয়া হতো। এখন সিসি ক্যামেরা লাগানোর কারণে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ম্যানেজ করা এবং ম্যানেজ হওয়া—দুটিই বন্ধ হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের এক তরুণ বলেন, এখনও মসজিদ, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কথা বলে ১০ হাজার ঘনফুট বালুর অনুমতিপত্র নিয়ে এক লাখ ঘনফুট বালু নেওয়ার চেষ্টা হয়।
বুধবার ধোপাজান নদীর পুলিশ চৌকিতে দায়িত্ব পালনকারী এএসআই জহিরুল বলেন, কোনো নৌকা তাঁদের নজরদারি এড়িয়ে চলে গেলেও সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করে ধরা সম্ভব। নৌকাটি কেমন ছিল বা সেখানে কারা ছিল, ফুটেজ দেখে আশপাশের মানুষের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া যাবে।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি খলিল রহমান বলেন, সুনামগঞ্জের বালু-পাথর নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে এবং সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বশীলদের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাও রয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সেই আস্থাহীনতার জায়গায় আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ এ সম্পদের সঙ্গে প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি রতন সেখ বলেন, ধোপাজান নদীর মুখে লাগানো অত্যাধুনিক ক্যামেরাটি তাঁর মোবাইলের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। সেখানে কোনো কিছু এলেই তাঁর মোবাইলে পাঁচ সেকেন্ডের ভিডিও চলে আসে। পুলিশ সুপারও বিষয়টি মনিটর করেন। বিদ্যুৎ না থাকলেও ক্যামেরা চালু থাকবে এবং সেখান থেকে ফুটেজ পাওয়া যাবে। পুলিশ চৌকিতেও কেউ অপকর্ম করার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে সেখানকার একজন কনস্টেবলকে ক্লোজ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, পুলিশ সম্প্রতি বালু লুটের ঘটনায় ৬৬টি মামলায় ৭৪১ জনকে আসামি করেছে। ৬০ জনকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। তবে কোনো আসামিই হাজতবাস করেননি। আইনের ফাঁকফোকরে তাঁরা বেরিয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে টাস্কফোর্স গঠন করে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বেআইনি কাজ যারা করবে, তাদের শাস্তিও তখন সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.