প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৩:১২
ব্রেন স্ট্রোকে স্মৃতিশক্তি হারালে কি নামাজ পড়তে হবে?

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং ঈমানের পর একজন মুসলিমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের সক্ষমতা, অসুস্থতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—যদি কেউ ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় অথবা এমন অবস্থায় পৌঁছান যে নামাজ আদায়ের নিয়মই মনে রাখতে পারেন না, তাহলে কি তার ওপর নামাজ ফরজ থাকবে?

ব্রেন স্ট্রোক ও নামাজের বিধান

যদি কোনো ব্যক্তি ব্রেন স্ট্রোক বা অন্য কোনো গুরুতর অসুস্থতার কারণে এমন অবস্থায় পৌঁছান যে তার জ্ঞান-বুদ্ধি বা স্মৃতিশক্তি কার্যত নষ্ট হয়ে যায়, নামাজের সময় চিনতে পারেন না, রাকাত মনে রাখতে পারেন না, কিংবা ইশারায়ও নামাজ আদায় করার সক্ষমতা না থাকে— তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তার দায়িত্ব তার সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।

যতদিন একজন ব্যক্তি জ্ঞান ও উপলব্ধি রাখেন, ততদিন তার সাধ্য অনুযায়ী নামাজ আদায় করতে হবে। দাঁড়িয়ে না পারলে বসে, বসে না পারলে শুয়ে, আর তাও সম্ভব না হলে ইশারায় নামাজ আদায়ের বিধান রয়েছে। কিন্তু যদি জ্ঞানশক্তি (স্মৃতিশক্তি) সম্পূর্ণ লোপ পায় এবং শরয়ি দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা না থাকে, তাহলে তিনি মুকাল্লাফ (শরিয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি) হিসেবে গণ্য থাকেন না।

পরিবারের করণীয়

অসুস্থ ব্যক্তির ওপর শরিয়তের বিধান হালকা হয়ে গেলেও পরিবারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তারা যেন ভালোবাসা ও যত্নের সঙ্গে তাকে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, অজু করতে সাহায্য করেন এবং যদি তিনি কিছুটা বুঝতে পারেন, তাহলে ধাপে ধাপে নামাজ আদায়ে সহযোগিতা করেন।

সালাফে সালিহীনের জীবনেও এর সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বিশিষ্ট তাবেঈ রুকাইন ইবন রাবী (রহ.) বলেন, ‘আমি একবার হযরত আসমা (রা.)-এর কাছে গেলাম। তখন তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন। দেখলাম, তিনি নামাজ আদায় করছেন এবং একজন নারী তাকে বলে দিচ্ছেন—এখন রুকু করুন, এখন সিজদা করুন।’ (মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা ৩৪৯৭)

এ থেকে বোঝা যায়, অসুস্থ ব্যক্তিকে নামাজে সহায়তা করা একটি মহৎ কাজ এবং এতে সওয়াবের আশা করা যায়।

কুরআনের আলোকে

১. আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেন না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৮৬)

২. সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ

‘তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর।’ (সুরা আত-তাগাবুন: আয়াত ১৬)

হাদিসের আলোকে

১. দাঁড়িয়ে না পারলে বসে, বসে না পারলে শুয়ে নামাজ

صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ

‘দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করো। যদি তা না পারো, তবে বসে আদায় করো। আর যদি তাও না পারো, তবে কাত হয়ে (শুয়ে) আদায় করো।’ (বুখারি ১১১৭)

২. জ্ঞান না থাকলে শরিয়তের দায়িত্ব থাকে না

رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ... وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ

‘তিন শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে (শরিয়তের দায়িত্বের) কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে... তাদের মধ্যে একজন হলো পাগল বা যার জ্ঞান নেই—যতক্ষণ না সে সুস্থ জ্ঞান ফিরে পায়।’ (আবু দাউদ ৪৪০৩, তিরমিজি ১৪২৩)

গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি দিক

যদি রোগীর জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পূর্ণ লোপ পায় এবং তিনি শরিয়তের নির্দেশ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে তার ওপর নামাজ ফরজ থাকে না। তবে যদি কখনো জ্ঞান ফিরে আসে এবং তিনি নামাজ আদায়ে সক্ষম হন, তাহলে সেই সময় থেকে আবার নামাজ আদায় করবেন।

অসুস্থতার সময় যেসব নামাজ আদায় সম্ভব হয়নি, সেগুলোর কাজা সম্পর্কে বিভিন্ন ফিকহি মাজহাবে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবস্থার ভিত্তিতে একজন নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

ইসলাম এমন একটি দীন, যা মানুষের দুর্বলতা, অসুস্থতা ও অক্ষমতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। আল্লাহ তাআলা কখনোই বান্দার ওপর তার সামর্থ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। তাই ব্রেন স্ট্রোক বা গুরুতর অসুস্থতার কারণে কেউ যদি জ্ঞানশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তবে শরিয়তের বিধানও তার অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের উচিত অসুস্থ ব্যক্তির পাশে থাকা, তার ইবাদতে যথাসম্ভব সহায়তা করা এবং আল্লাহর রহমতের আশা রাখা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুস্থতা দান করুন, ইবাদতের তৌফিক দিন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নামাজের হেফাজত করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।